১। রত্নাকরে অনেক রত্ন আছে; তুমি এক ডুবে পেলে না বলে রত্নাকরকে রত্নহীন মনে করো না। সেইরূপ একটু সাধনা ক'রে ঈশ্বরদর্শন হল না বলে হতাশ হয়ো না। ধৈর্য ধরে সাধন করতে থাক, যথাসময়ে ঈশ্বরের কৃপা তোমার ওপর হবে।
২। সমুদ্রে একরকম ঝিনুক আছে, তারা সদা-সর্বদা হাঁ ক'রে জলের ওপর ভাসে, কিন্তু স্বাতী নক্ষত্রের এক ফোঁটা জল তাদের মুখে পড়লে তারা মুখ বন্ধ ক'রে একেবারে জলের নিচে চলে যায়। আর ওপরে আসে না। তত্ত্বপিপাসু বিশ্বাসী সাধকও সেইরকম গুরুমন্ত্ররূপ এক ফোঁটা জল পেয়ে সাধনের অগাধ জলে একেবারে ডুবে যায়, আর অন্য দিকে চেয়ে দেখে না।
৩। যেমন কোন ধনী লোকের কাছে যেতে হলে সেপাই-সান্ত্রীকে অনেক খোসামোদ করতে হয়, তেমনি ঈশ্বরের কাছে যেতে হলে অনেক সাধন-ভজন ও সৎসঙ্গ আদি নানা উপায়ের দ্বারা যেতে হয়।
৪। এক কাঠুরে বন থেকে কাঠ এনে কোন রকমে দুঃখে কষ্টে দিন কাটাত। একদিন জঙ্গল থেকে সরু সরু কাঠ কেটে মাথায় ক'রে আনছে, হঠাৎ একজন লোক সেই পথ দিয়ে যেতে যেতে তাকে ডেকে বললে, "বাপু এগিয়ে যাও।" পরদিন কাঠুরে সেই লোকের কথা শুনে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে মোটা মোটা কাঠের জঙ্গল দেখতে পেলে; সেদিন যতদূর পারলে কেটে এনে বাজারে বেচে অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশী পয়সা পেলে। পরদিন আবার সে মনে মনে ভাবতে লাগল, তিনি আমায় এগিয়ে যেতে বলেছেন; ভাল, আজ আর একটু এগিয়ে দেখি না কেন। সে এগিয়ে গিয়ে চন্দন কাঠের বন দেখতে পেলে। সেই চন্দন কাঠ মাথায় ক'রে নিয়ে বাজারে বেচে অনেক বেশী টাকা পেলে। পরদিন আবার মনে করলে, আমায় এগিয়ে যেতে বলেছেন। সে সেদিন আরও খানিক দূর এগিয়ে গিয়ে তামার খনি দেখতে পেলে। সে তাতেও না ভুলে দিন দিন আরও যত এগিয়ে যেতে লাগল - ক্রমে ক্রমে রূপা, সোনা, হীরার খনি পেয়ে মহা ধনী হয়ে পড়ল। ধর্মপথেরও ঐরূপ। কেবল এগিয়ে যাও। একটু আধটু রূপ, জ্যোতি দেখে বা সিদ্ধাই লাভ ক'রে আহ্লাদে মনে করো না যে, আমার সব হয়ে গেছে।
৫। যে মাছ ধরতে ভালবাসে, সে যদি শোনে যে অমুক পুকুরে বড় বড় মাছ আছে, সে কি করে? যারা সেই পুকুরে মাছ ধরেছে, সে যদি তাদের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা ক'রে বেড়ায় - সত্যি সত্যি সে পুকুরে বড় বড় মাছ আছে কিনা, যদি থাকে তবে কিসের চার ফেলতে হয়, কি টোপ খায় - এ-সব বিষয় ভাল ক'রে জেনে নিয়ে যদি তাকে মাছ ধরতে যেতে হয়, তাহলে তার মাছ তো একেবারেই ধরা হয় না। সেখানে গিয়ে ছিপ ফেলে ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হয়, তারপর সে মাছের ঘাই ও ফুট দেখতে পায় এবং তারপর সে মাছ ধরতে পারে। ধর্মরাজ্যেরও সেইরূপ; সাধক ও মহাজনদের কথায় বিশ্বাস ক'রে, ভক্তি-চার ছড়িয়ে, ধৈর্যরূপ ছিপ ফেলে বসে থাকতে হয়।
৬। একটি লোক পরমহংসদেবের নিকট এসে বললে, "মহাশয়, অনেকদিন সাধন-ভজন করলুম, কিছুই তো বুঝতে সুঝতে পারলুম না, আমাদের সাধন-ভজন করা মিছে।" পরমহংসদেব ঈষৎ হাস্য ক'রে বললেন, "দেখ, যারা খানদানী চাষা, তারা বার বৎসর অনাবৃষ্টি হলেও চাষ দিতে ছাড়ে না; আর যারা ঠিক চাষা নয়, চাষের কাজে বড় লাভ শুনে কারবার করতে আসে, তারাই এক বৎসর বৃষ্টি না হলে চাষ ছেড়ে দিয়ে পালায়; তেমনি যারা ঠিক ঠিক ভক্ত ও বিশ্বাসী, তারা সমস্ত জীবন তাঁর দর্শন না পেলেও তাঁর নাম-গুণকীর্তন করতে ছাড়ে না।"
৭। যেমন সাঁতার দিতে হলে আগে অনেক দিন ধরে জলে হাত-পা ছুঁড়তে হয়, একবারেই সাঁতার দেওয়া যায় না; সেইরূপ ব্রহ্মরূপ সমুদ্রে সাঁতার দিতে গেলে অনেকবার উঠতে পড়তে হয়, একবারে হয় না।
No comments:
Post a Comment