Sunday, February 11, 2018

সিদ্ধ অবস্থা

১। লোহা যদি একবার স্পর্শমণি ছুঁয়ে সোনা হয়, তাকে মাটির ভেতর চাপা রাখ আর আস্তাকুঁড়ে ফেলে রাখ, সে সোনা। যিনি সচ্চিদানন্দ লাভ করেছেন, তাঁর অবস্থাও সেই রকম। তিনি সংসারেই থাকুন, আর বনেই থাকুন, তাতে তাঁর দোষস্পর্শ হয় না।

২। যেমন লোহার তলোয়ার স্পর্শমণি ছোঁয়ালে সোনার তলোয়ার হয়, আকার-প্রকার সেই রকমই থাকে, কিন্তু তাতে আর হিংসার কাজ চলে না; সেই রকম ভগবানের পাদপদ্ম স্পর্শ করলে তার দ্বারা আর কোন অন্যায় কাজ হয় না।

৩। কোন ব্যক্তি পরমহংসদেবের নিকট জিজ্ঞাসা করলেন - সিদ্ধপুরুষ হলে কিরূপ অবস্থা হয়? উত্তরে তিনি বললেন - যেমন আলু-বেগুন সিদ্ধ হলে নরম হয়, তেমনি সিদ্ধপুরুষের স্বভাব নরম হয়ে থাকে। তাঁর সব অভিমান চলে যায়।

৪। পরমহংসদেব নিজের শরীরের দিকে দেখিয়ে বলতেন, "এ একটা খোলমাত্র, মা ব্রহ্মময়ী একে আশ্রয় ক'রে খেলছেন।"

৫। রামপ্রসাদী গান যখনই শোন, তখনই নূতন বলে বোধ হয়। তার কারণ জান? রামপ্রসাদ যখন গান বাঁধতেন, মা ব্রহ্মময়ী তাঁর হৃদয়মধ্যে বিরাজ করতেন।

৬। সংসারে অনেক প্রকারে সিদ্ধ অবস্থা লাভ হয়, যেমন - স্বপ্ন-সিদ্ধ, মন্ত্র-সিদ্ধ, হঠাৎ-সিদ্ধ ও নিত্য-সিদ্ধ।

৭। স্বপ্নেতে কেহ কেহ ইষ্টমন্ত্র পেয়ে তাই জপ ক'রে সিদ্ধ হয়। মন্ত্র-সিদ্ধ - সদ্গুরুর নিকট মন্ত্রগ্রহণ ক'রে সাধনার দ্বারা সিদ্ধ হয়। হঠাৎ-সিদ্ধ - দৈবযোগে কোন মহাপুরুষের কৃপালাভ ক'রে যে সিদ্ধ হয়, তাকে হঠাৎ-সিদ্ধ বলে। নিত্য-সিদ্ধ - তাদের বালককাল থেকেই ধর্মে মতি থাকে। যেমন লাউ, কুমড়ো গাছে আগে ফল হয়, পরে ফুল ফোটে।

৮। সাঁকোর নিচে জল সহজে বেরিয়ে যায়, জমে না; তেমনি মুক্ত পুরুষদিগের হাতে যে টাকা-পয়সা আসে তা থাকে না, অমনি খরচ হয়ে যায়। তাঁদের বিষয়-বুদ্ধি একেবারেই নেই।

৯। "ধ্যান-সিদ্ধ যেই জন, মুক্তি তার ঠাঁই।" ধ্যান-সিদ্ধ কাদের বলে জান? যাঁরা ধ্যান করতে বসলেই ভগবানের ভাবে বিভোর হয়ে যায়।

১০। মুক্ত পুরুষ সংসারে কি রকম থাকেন জান? যেমন পানকৌড়ি জলে থাকে, কিন্তু তাদের গায়ে জল লাগে না; যদিও গায়ে একটু জল লাগে, তা হলে একবার গা ঝেড়ে ফেললে তখনই সব চলে যায়।

১১। জাহাজ যে দিকে যাক্ না কেন কম্পাসের কাঁটা উত্তর দিকেই থাকে, তাই জাহাজের দিক ভুল হয় না; মানুষের মন যদি ঈশ্বরের দিকে থাকে, তা হলে আর তার কোন ভয় থাকে না।

১২। চকমকি পাথর শত বৎসর জলের ভেতর পড়ে থাকলেও তার আগুন নষ্ট হয় না, তুলে লোহার ঘা মারবামাত্রই আগুন বেরোয়। ঠিক বিশ্বাসী ভক্ত হাজার হাজার কুসঙ্গের মধ্যে পড়ে থাকলেও তার বিশ্বাস-ভক্তি কিছুতেই নষ্ট হয় না, ভগবৎ-কথা হলে তখনি আবার সে ঈশ্বর-প্রেমে উন্মত্ত হয়।

১৩। যে যেরূপ ভাবনা ক'রে থাকে, তার সিদ্ধিও সেইরকম হয়ে থাকে। যেমন দৃষ্টান্ততে বলে, আরসোলা কাঁচপোকাকে ভেবে ভেবে কাঁচপোকা হয়ে যায়। তেমনি যে সচ্চিদানন্দকে ভাবনা করে, সেও আনন্দময় হয়ে যায়।

১৪। মাতালেরা যেমন নেশার ঝোঁকে পরনের কাপড় কখনও মাথায় বাঁধে এবং কখনও বগলে নিয়ে বেড়ায়, তেমনি সিদ্ধ মহাপুরুষদেরও বাহ্য অবস্থা প্রায় সেইরূপই হয়ে থাকে।

১৫। অহঙ্কার কি রকম জান? যেমন পদ্মের পাঁপড়ি ও নারকেল সুপারির বালতো, খসে গেলেও সেস্থানে একটা দাগ থাকে; তেমনি অহঙ্কার গেলে তাতে একটু দাগের চিহ্ন থাকেই থাকে। তবে সে অহঙ্কারে কারও কিছু অনিষ্ট করতে পারে না। তার দ্বারা খাওয়া-দাওয়া, শোয়া ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোন কর্ম চলে না।

১৬। যেমন আম পাকলে বোঁটা থেকে আপনি খসে পড়ে, তেমনি জ্ঞানলাভ হলে আত্মাভিমান প্রভৃতি আপনি চলে যায়। জোর ক'রে জাতি ত্যাগ করা ঠিক নয়।

১৭। গুণ তিন রকমের - সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। এই তিন গুণের কেউ তাঁর নিকট পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না। যেমন একজন লোক বনের পথ দিয়ে চলে যাচ্ছিল, এমন সময় তিনজন ডাকাত এসে তাকে ধরলে ও তার যা-কিছু ছিল সর্বস্ব কেড়ে-কুড়ে নিলে; তার ভেতর একজন ডাকাত বললে, "এ লোকটাকে রেখে আর কি হবে?" এই কথা বলেই, খাঁড়া উঁচিয়ে তাকে কাটতে এল। আর একজন ডাকাত এসে বললে, "না হে, একে কেটো না, কেটে কি হবে? এর হাত-পা বেঁধে এইখানেই ফেলে রেখে যাও।" পরে সকলে মিলে তার হাত-পা বেঁধে সেখানে রেখে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বললে, "আহা, তোমার কত লেগেছে, এস আমি এখন তোমার বন্ধন খুলে দিই।" ডাকাতটি তখন বন্ধন খুলে দিয়ে বললে, "আমার সঙ্গে সঙ্গে এস তোমায় রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি।" পরে রাস্তার নিকটবর্তী হয়ে বললে, "ঐ রাস্তা ধরে চলে গেলে তুমি বাড়ি পৌঁছুবে।" লোকটি তখন তাকে বলতে লাগল, "আপনি আমার প্রাণদান করলেন, আপনি আমার বাড়ি পর্যন্ত আসুন।" ডাকাত তখন বললে, "আমি সেখানে যেতে পারব না, লোকে টের পাবে - আমি কেবল তোমাকে রাস্তা দেখিয়ে চললুম।"

১৮। মুক্ত পুরুষ সংসারে কিরূপ অবস্থায় থাকে জান? যেমন ঝড়ের এঁটো পাতা। নিজের কোন ইচ্ছা বা অভিমান থাকে না। বাতাসে তাকে উড়িয়ে যে দিকে নিয়ে যায়, সেই দিকে যায় - কখনও বা আস্তাকুঁড়ে, কখনও বা ভাল জায়গায়।

১৯। পরমহংসদেব বলতেন, "গুরু, কর্তা, বাবা - এই তিন কথায় আমার গায়ে কাঁটা বেঁধে। ঈশ্বর কর্তা, আমি অকর্তা, তিনি যন্ত্রী, আমি যন্ত্র।"

২০। যতদিন শুধু ধান থাকে, পুঁতে দিলেই গাছ হয়। কিন্তু সেই ধানকে সিদ্ধ ক'রে পুঁতলে আর গাছ হয় না; তেমনি যাঁরা সিদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের আর এ সংসারে জন্মগ্রহণ করতে হয় না।

২১। পরমহংস অবস্থা কাকে বলে জান? যেমন হাঁসকে দুধে-জলে এক সঙ্গে দিলে, দুধ খেয়ে জলটি ফেলে রাখে। তাঁরা তেমনি সংসারে সার যে সচ্চিদানন্দ, তাঁকে গ্রহণ করেন, আর অসার যে সংসার, তাকে ত্যাগ করেন।

২২। প্রথমতঃ অজ্ঞান, তার পরে জ্ঞান। পরিশেষে যখন সচ্চিদানন্দ লাভ হয়, তখন জ্ঞান ও অজ্ঞানের পারে চলে যায়। যেমন গায়ে কাঁটা ফুটলে বাইরে থেকে যত্ন ক'রে আর একটি কাঁটা এনে কাঁটাটিকে তুলে ফেলে তারপর দুটি কাঁটাই ফেলে দেয়।

২৩। যে ব্যক্তি সিদ্ধিলাভ করেছেন অর্থাৎ যাঁর ঈশ্বর-সাক্ষাৎকার হয়েছে, তাঁর দ্বারা আর কোনরূপ অন্যায় কার্য হতে পারে না; যেমন যে নাচতে জানে, তার পা কখনো বেতালে পড়ে না।

২৪। বৃহস্পতির পুত্র কচের সমাধিভঙ্গের পর যখন মন বহির্জগতে নেমে আসছিল, তখন ঋষিরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "এখন তোমার কিরূপ অনুভূতি হচ্ছে?" তাতে তিনি বলেছিলেন, "সর্বং ব্রহ্মময়ং - তিনি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।"

No comments:

Post a Comment