১। যেমন গ্যাসের আলো এক স্থান হতে এসে শহরে নানা স্থানে নানা ভাবে জ্বলছে, তেমনি নানা দেশের নানা জাতের ধার্মিক লোক সেই এক ভগবান্ হতে আসছে।
২। ছাতের উপর উঠতে হলে মই, বাঁশ, সিঁড়ি ইত্যাদি নানা উপায়ে যেমন ওঠা যায়, তেমনি এক ঈশ্বরের কাছে যাবার অনেক উপায় আছে। প্রত্যেক ধর্মই এক-একটি উপায়।
৩। ঈশ্বর এক, তাঁর অনন্ত নাম ও অনন্ত ভাব। যার যে নামে ও যে ভাবে ডাকতে ভাল লাগে, সে সেই নামে ও সেই ভাবে ডাকলে দেখা পায়।
৪। কোন ব্যক্তি যে ভাবে, যে নামে ও যে রূপেই হোক না কেন সেই এক অদ্বিতীয় সচ্চিদানন্দ-জ্ঞানে যদি সাধন-ভজন করে, তবে তার ভগবানলাভ নিশ্চয়ই হবে।
৫। যত মত, তত পথ। যেমন এই কালীবাড়িতে আসতে হলে কেউ নৌকায়, কেউ গাড়ীতে, কেউ বা হেঁটে আসে, সেইরূপ ভিন্ন ভিন্ন মতের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন লোকের সচ্চিদানন্দ লাভ হয়ে থাকে।
৬। মার ভালবাসা সব ছেলের প্রতি সমান, কিন্তু কোন ছেলের জন্য লুচি, কারও জন্য খই-বাতাসা প্রভৃতি যার যেমন আবশ্যক বোঝেন, সেই রকমেরই ব্যবস্থা ক'রে থাকেন। সেইরূপ ভগবানও বিভিন্ন সাধকের শক্তি ও অবস্থানুযায়ী সাধনের ব্যবস্থা করেন।
৭। মহাত্মা কেশবচন্দ্র সেন ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, "ভগবান্ এক, তবে ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর এত বাদ-বিসংবাদ দেখা যায় কেন?" উত্তরে পরমহংসদেব বললেন, "যেমন এই পৃথিবীতে এটা আমার জমি ও এই আমার বাড়ি বলে ঘিরে বসে থাকে; কিন্তু ওপরে সেই এক অনন্ত আকাশ, সেখানে যেমন কেউ ঘিরতে পারে না, তেমনি মানুষ অজ্ঞানে আপনার আপনার ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলে বৃথা গোলমাল করে। যখন ঠিক ঠিক জ্ঞানলাভ হয়, তখন আর পরস্পরের মধ্যে বিবাদ থাকে না।"
৮। হিন্দুদের মধ্যে যখন নানা মতের কথা শুনতে পাওয়া যায়, তখন আমাদের পক্ষে কোন্ মত শ্রেয়? আমরা কোন্ মত গ্রহণ করব? পার্বতী মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "ঠাকুর, সচ্চিদানন্দরূপের খেই কোথায়?" মহাদেব বললেন, "বিশ্বাস।" মতে কিছু আসে যায় না। যিনি যে মন্ত্রে দীক্ষিত হন না কেন, বিশ্বাসের সহিত তিনি তারই সাধন করুন।
৯। যাদের সঙ্কীর্ণ ভাব, তারাই অন্যের ধর্মকে নিন্দা করে ও আপনার ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলে দল পাকায়; আর যারা ঈশ্বরানুরাগী - কেবল সাধন-ভজন করতে থাকে, তাদের ভেতর কোনরূপ দলাদলি থাকে না; যেমন পুষ্করিণী বা গেড়ে ডোবায় দল জন্মায়, নদীতে কখনও জন্মায় না।
১০। ভগবান্ এক, সাধক ও ভক্তেরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ও রুচি অনুসারে তাঁর উপাসনা ক'রে থাকে। যেমন গৃহস্থেরা একটা বড় মাছ বাড়িতে এলে কেউ ঝোল করে, কেউ ভাজে, কেউ তেল-হলুদে চচ্চড়ি করে, কেউ ভাতে দিয়ে, কেউ কেউ বা অম্বল ক'রে খেয়ে থাকে। সেইরূপ যাদের যেমন রুচি, তারা সেই রকম ভাবে ভগবানের সাধন-ভজন-উপাসনা ক'রে থাকে।
১১। যেমন জল এক পদার্থ - দেশ, কাল, পাত্র-ভেদে তার ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়। বাঙ্গালা দেশে জল বলে, হিন্দিতে পানি বলে, ইংরাজীতে ওয়াটার বা একোয়া বলে। পরস্পরের ভাষা না জানা থাকলে কারুর কথা কেউ বুঝতে পারে না, কিন্তু জানলে আর ভাবের কোনরূপ ব্যতিক্রম হয় না।
১২। ভগবানের নাম ও চিন্তা যে রকম করেই কর না কেন, তাতেই কল্যাণ হবে। যেমন মিছরির রুটি সিধে করে খাও বা আড় করেই খাও খেলে মিষ্টি লাগবেই লাগবে।
No comments:
Post a Comment