১। লুকোচুরি খেলায় যেমন বুড়ী ছুঁলে চোর হয় না, সেই রকম ভগবানের পাদপদ্ম ছুঁলে আর সংসারে বদ্ধ হয় না। যে বুড়ী ছুঁয়েছে তাকে আর চোর করবার যো নেই। সংসারে সেই রকম যিনি ঈশ্বরকে আশ্রয় করেছেন, তাঁকে আর কোন বিষয়ে আবদ্ধ করতে পারে না।
২। পাড়াগাঁয়ে মাছ ধরবার জন্য বিলের ধারে এবং মাঠে ঘুনি পাতে। ঘুনির ভেতর চিক্ চিক্ ক'রে জল যায় দেখে ছোট ছোট মাছগুলি আনন্দে তার ভেতর চলে যায়, তারা আর বার হতে পারে না, সেইখানে আটকে যায়, পরে একেবারে প্রাণে মরে। দুটো একটা মাছ ঘুনির নিকটে গিয়ে ঐ দেখে একেবারে লাফিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। সংসারেও বাহ্য চাকচিক্য দেখে লোকে সাধ ক'রে প্রবেশ করে, পরে মায়ামোহে জড়িয়ে দুঃখকষ্ট পেয়ে নাশ পায়; আর যাঁরা এই সব দেখে কামকাঞ্চনে আসক্ত না হয়ে ভগবানের পাদপদ্ম আশ্রয় করেন তাঁরাই যথার্থ সুখ ও আনন্দ পান।
৩। রামপ্রসাদ বলেছিলেন, এ সংসার ধোঁকার টাটি। কিন্তু হরিপাদপদ্মে ভক্তি লাভ করতে পারলে এই সংসারই আবার হয়
"- মজার কুটী।
আমি খাই দাই আর মজা লুটি॥
জনক রাজা মহাতেজা তার কিসে ছিল ত্রুটি।
সে এদিক ওদিক দুদিক রেখে খেয়েছিল
দুধের বাটি॥"
৪। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, "সংসারে থেকে ঈশ্বর-উপাসনা কি সম্ভব?" পরমহংসদেব একটু হেসে বললেন, "ও দেশে দেখেছি, সব চিড়ে কোটে; একজন স্ত্রীলোক এক হাতে ঢেঁকির গড়ের ভেতর হাত দিয়ে নাড়ছে, আর এক হাতে ছেলে কোলে নিয়ে মাই খাওয়াচ্ছে, ওর ভেতর আবার খদ্দের আসছে, তার সঙ্গে হিসাব করছে - 'তোমার কাছে ওদিনের এত পাওনা আছে, আজকের এত দাম হল।' এই রকম সে সব কাজ করছে বটে, কিন্তু তার মন সর্বক্ষণ ঢেঁকির মুষলের দিকে আছে; সে জানে যে ঢেঁকিটি হাতে পড়ে গেলে হাতটি জন্মের মতো যাবে। সেইরূপ সংসারে থেকে সকল কাজ কর; কিন্তু মন রেখো তাঁর প্রতি। তাঁকে ছাড়লে সব অনর্থ ঘটবে।"
৫। সংসারের মধ্যে বাস ক'রে যিনি সাধনা করতে পারেন, তিনিই ঠিক বীর সাধক। বীরপুরুষ যেমন মাথায় বোঝা নিয়ে আবার অন্য দিকে তাকাতে পারে, বীর সাধক তেমনি এ সংসারের বোঝা ঘাড়ে ক'রে ভগবানের পানে চেয়ে থাকে।
৬। হিন্দুস্থানী মেয়েরা মাথায় ক'রে ৪।৫ টি জলভরা কলসী নিয়ে যায়। পথে আত্মীয় লোকদের সঙ্গে গল্প করে, সুখ-দুঃখের কথা কয়, কিন্তু তাদের মন থাকে মাথার কলসীর ওপর, যেন সেটি পড়ে না যায়। ধর্মপথের পথিকদেরও সকল অবস্থার ভেতরে ঐ রকম দৃষ্টি রাখতে হবে, মন যেন তাঁর পথ থেকে পড়ে না যায়।
৭। বাউল যেমন দুহাতে দুরকম বাজনা বাজায় ও মুখে গান করে, হে সংসারী জীব! তোমরাও তেমনি হাতে সমস্ত কাজকর্ম কর, কিন্তু মুখে সর্বদা ঈশ্বরের নাম জপ করতে ভুলো না।
৮। নষ্ট স্ত্রীলোক যেমন আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে থেকে সংসারের সব কাজ করে কিন্তু মন পড়ে থাকে উপপতির ওপর - সে কাজ করতে করতে সর্বদা ভাবে যে কখন তার সঙ্গে দেখা হবে; তোমাদেরও সংসারের কাজ করতে করতে মন সর্বদা যেন ভগবানের দিকে পড়ে থাকে।
৯। নির্লিপ্তভাবে সংসার করা কি রকম জান? পাঁকাল মাছের মতন। পাঁকাল মাছ যেমন পাঁকের মধ্যে থাকে কিন্তু তার গায়ে পাঁক লাগে না।
১০। দাঁড়িপাল্লার যে দিক্ ভারী হয় সেই দিক্ ঝুঁকে পড়ে, আর যে দিক্ হাল্কা হয় সেই দিক্ ওপরে উঠে যায়। মানুষের মন দাঁড়িপাল্লার ন্যায় - তার এক দিকে সংসার, আর এক দিকে ভগবান্। যার সংসার, মান-সম্ভ্রম, ইত্যাদির ভার বেশী হয়, তার মন ভগবান্ থেকে উঠে গিয়ে সংসারের দিকে ঝুঁকে পড়ে; আর যার বিবেক-বৈরাগ্য ও ভগবদ্ভক্তির ভার বেশী হয়, তার মন সংসার থেকে উঠে গিয়ে ভগবানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
১১। একজন সমস্ত দিন ধরে আখের ক্ষেতে জল ছেঁচে শেষে ক্ষেতে গিয়ে দেখল যে এক ফোঁটা জলও ক্ষেতে যায়নি, দূরে কতকগুলি গর্ত ছিল তা দিয়ে সমস্ত জল অন্যদিকে বেরিয়ে গেছে। সেই রকম যিনি বিষয়বাসনা, সাংসারিক মান-সম্ভ্রম ইত্যাদির দিকে মন রেখে সাধন করেন, শেষে দেখতে পাবেন যে ঐ সকল বাসনারূপ ছেঁদা দিয়ে তাঁর সমুদয় বেরিয়ে গেছে।
১২। বালক যেমন এক হাত দিয়ে খোঁটা ধরে বন্ বন্ ক'রে ঘুরতে থাকে, একবারও ভয় করে না, কিন্তু তার মন সেই খোঁটার দিকে সর্বদা পড়ে আছে - সে মনে জানে যে, খোঁটাটি ছাড়লেই আমি পড়ে যাব; সংসারেও সেই রকম ভগবানের দিকে মন রেখে সকল কাজ কর, কিন্তু মন যেন তাঁর প্রতি সর্বদা থাকে; তা হলে নিরাপদে থাকবে।
১৩। সংসারে সুখের লোভে অনেকে ধর্মকর্ম ক'রে থাকে, একটু দুঃখকষ্ট পেলে কিংবা মরবার সময় তারা সব ভুলে যায়; যেমন টিয়া পাখি এম্নে সমস্ত দিন রাধাকৃষ্ণ বলে, কিন্তু বেড়ালে যখন ধরে, তখন রাধাকৃষ্ণ ভুলে গিয়ে নিজের বোল 'ক্যাঁ ক্যাঁ' করতে থাকে।
১৪। জলে নৌকা থাকে ক্ষতি নেই, কিন্তু নৌকার ভেতর যেন জল না ঢোকে, তা হলে ডুবে যাবে। সাধক সংসারে থাকুক ক্ষতি নেই কিন্তু সাধকের মনের ভেতর যেন সংসারভাব না থাকে।
১৫। সংসার কেমন? যেমন আমড়া - শাঁসের সঙ্গে খোঁজ নেই, কেবল আঁটি আর চামড়া; খেলে হয় অম্লশূল।
১৬। যেমন কাঁঠাল ভাঙতে গেলে লোকে আগে বেশ ক'রে হাতে তেল মেখে নেয় তা হলে আর হাতে কাঁঠালের আঠা লাগে না; তেমনি এই সংসাররূপ কাঁঠালকে যদি জ্ঞানরূপ তেল হাতে মেখে সম্ভোগ করা যায়, তা হলে কামিনীকাঞ্চনরূপ আঠার দাগ আর মনে লাগতে পারবে না।
১৭। সাপকে ধরতে গেলে তখনই তাকে দংশন ক'রে দেবে, কিন্তু যে ব্যক্তি ধুলোপড়া জানে, সে সাতটা সাপকে ধরে গলায় জড়িয়ে বেশ খেলা দেখাতে পারে; তেমনি বিবেকবৈরাগ্যরূপ ধুলোপড়া শিখে কেউ যদি সংসার করে, তাকে আর সাংসারিক মায়া-মমতায় আবদ্ধ করতে পারে না।
১৮। ভেতরে যার যে ভাব থাকে, তার কথাবার্তায় তা বেরিয়ে পড়ে; যেমন মূলো খেলে তার ঢেকুরে মূলোর গন্ধ বেরোয়। তেমনি সংসারী লোকেরা সাধুসঙ্গ করতে এসে বিষয়ের কথাই বেশী কয়ে থাকে।
১৯। মনই সব জানবে। জ্ঞানই বলো আর অজ্ঞানই বলো, সবই মনের অবস্থা। মানুষ মনেই বদ্ধ ও মনেই মুক্ত, মনেই সাধু এবং মনেই অসাধু, মনেই পাপী ও মনেই পুণ্যবান। সংসারী জীব মনেতে সর্বদা ভগবানকে স্মরণ-মনন করতে পারলে তাদের আর অন্য কোন সাধনের দরকার হয় না।
২০। জ্ঞানলাভ হলে তারা সংসারে কি রকম ভাবে থাকে জান? যেমন সার্সির ঘরে বসে থাকলে ভেতরের ও বাহিরের - দুই দেখতে পায়।
২১। গীতা পড়লে যা হয় আর দ্বাদশবার 'গীতা' শব্দ উচ্চারণ করলে তাই বোঝায়, যেমন - 'গী তাগী তাগী তাগী'। কি না হে জীব! সব ত্যাগ ক'রে ভগবানের পাদপদ্ম আশ্রয় কর।
No comments:
Post a Comment