১। মায়ার স্বভাব কেমন জান? যেমন জলের পানা। ঢেইয়ে দিলে, সব পানা সরে গেল। আবার একটু পরেই আপনাআপনি পুরে এল। তেমনি যতক্ষণ বিচার কর, সাধুসঙ্গ কর, যেন কিছুই নেই। একটু পরেই বিষয়বাসনা আবরণ করে।
২। সাপের মুখে বিষ আছে; সে যখন আপনি খায় তখন তার বিষ লাগে না, কিন্তু যখন অন্যকে খায়, তখন বিষ লাগে। তেমনি ভগবানের মায়া আছে বটে, কিন্তু তাঁকে মুগ্ধ করতে পারে না; অন্যকে সে মায়ায় মুগ্ধ করে।
৩। মায়া কাকে বলে জান? - বাপ, মা, ভাই, ভগ্নী, স্ত্রী, পুত্র, ভাগ্নে, ভাইপো, ভাইঝি - এই সব আত্মীয়দের প্রতি টান ও ভালবাসা; আর দয়া মানে - সর্বভূতে আমার হরি আছেন এই জেনে সকলকে সমান ভালবাসা।
৪। যাকে ভূতে পায় সে যদি জানতে পারে যে তাকে ভূতে পেয়েছে, তা হলে ভূত পালিয়ে যায়। মায়াচ্ছন্ন জীব যদি একবার ঠিক জানতে পারে যে, তাকে মায়ায় আচ্ছন্ন করেছে তা হলে মায়া তার নিকট থেকে তখনই পালায়।
৫। জীবাত্মা-পরমাত্মার মধ্যে এক মায়া-আবরণ আছে। এই মায়া-আবরণ না সরে গেলে পরস্পরের সাক্ষাৎ হয় না। যেমন অগ্রে রাম, মধ্যে সীতা এবং পশ্চাতে লক্ষ্মণ। এস্থলে রাম পরমাত্মা ও লক্ষ্মণ জীবাত্মাস্বরূপ, মধ্যে জানকী মায়া-আবরণ হয়ে রয়েছেন। যতক্ষণ মা জানকী মধ্যে থাকেন, ততক্ষণ লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান না। জানকী একটু সরে পাশ কাটালে তখন লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান।
৬। মায়া দুই প্রকার - বিদ্যা এবং অবিদ্যা। তার মধ্যে বিদ্যা মায়া দুই প্রকার - বিবেক এবং বৈরাগ্য। এই বিদ্যা মায়া আশ্রয় ক'রে জীব ভগবানের শরণাপন্ন হয়। আর অবিদ্যা মায়া ছয় প্রকার - কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ এবং মাৎসর্য। অবিদ্যা মায়া 'আমি' ও 'আমার' জ্ঞানে মনুষ্যদিগকে বদ্ধ করে রাখে। কিন্তু বিদ্যা মায়ার প্রকাশে জীবের অবিদ্যা একেবারে নাশ হয়ে যায়।
৭। যেমন যতক্ষণ জল ঘোলা থাকে, ততক্ষণ চন্দ্রসূর্যের প্রতিবিম্ব তাতে ঠিক ঠিক দেখা যায় না, তেমনি মায়া অর্থাৎ 'আমি' এবং 'আমার' এই জ্ঞান যতক্ষণ না যায়, ততক্ষণ আত্মার সাক্ষাৎকার ঠিক ঠিক হয় না।
৮। যেমন সূর্য পৃথিবীকে আলো করে রেখেছেন, কিন্তু সামান্য এক খণ্ড মেঘ সম্মুখে এসে যদি আবরণ করে ফেলে তা হলে আর সূর্য দৃষ্টিগোচর হন না; সেইরূপ সর্বব্যাপী ও সর্বসাক্ষিস্বরূপ সচ্চিদানন্দকে আমরা সামান্য মায়া-আবরণবশতঃ দেখতে পাচ্ছি না।
৯। পানাপুকুরে নেবে যদি পানাকে সরিয়ে দাও আবার তখন এসে জোটে; সেই রকম মায়াকে ঠেলে দিলেও আবার মায়া এসে জোটে। তবে যদি পানাকে সরিয়ে বাঁশ বেঁধে দেওয়া যায়, তা হলে আর বাঁশ ঠেলে আসতে পারে না। সেই রকম মায়াকে সরিয়ে দিয়ে জ্ঞান ভক্তির বেড়া দিতে পারলে আর মায়া তার ভেতর আসতে পারে না। সচ্চিদানন্দই কেবলমাত্র প্রকাশ থাকেন।
১০। দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুরবাড়ির নহবতখানার ওপর একটি সাধু এসে কিছুদিন বাস করেছিলেন। সাধু সেই ঘরে কারও সহিত বাক্যালাপ ইত্যাদি কিছু না ক'রে সর্বদা ধ্যানধারণা করতেন। একদিন হঠাৎ মেঘ উঠে চারিদিক অন্ধকার ক'রে ফেললে। কিছুক্ষণ পরে একটা ঝড়ের মতো খুব বাতাস এসে মেঘগুলিকে আবার সরিয়ে দিলে। সাধু তাই দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উক্ত নহবতখানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে খুব হাসি ও নৃত্য করতে লাগলেন। তাই দেখে ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি তো ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে থাক - আজ এত আনন্দ নৃত্যাদি করছ কেন?" সাধু বললেন, "সংসারকা মায়া এয়সা হী হ্যায়।" প্রথমে পরিষ্কার আকাশ, হঠাৎ মেঘ এসে অন্ধকার ক'রে ফেললে, আবার কিছুক্ষণ পরেই যা ছিল তাই রইল।
No comments:
Post a Comment