Sunday, February 11, 2018

জীবের অবস্থাভেদ

১। মানুষ - যেমন বালিশের খোল; বালিশের ওপর দেখতে কোনটা লাল, কোনটা কাল; কিন্তু সকলের ভেতরে সেই একই তুলো। মানুষ দেখতে কেউ সুন্দর; কেউ কাল; কেউ সাধু, কেউ অসাধু; কিন্তু সকলের ভেতর সেই এক ঈশ্বরই বিরাজ করছেন।

২। সংসারে দুরকম স্বভাবের লোক দেখতে পাওয়া যায় - কতকগুলো কুলোর ন্যায় স্বভাববিশিষ্ট আর কতকগুলো চালুনির ন্যায়। কুলো যেমন ভূষি প্রভৃতি অসার বস্তু সব পরিত্যাগ ক'রে সার বস্তু যে শস্য সেইগুলি আপনার ভেতরে রাখে, সেইরকম কতকগুলি লোক সংসারের অসার বস্তু (কামকাঞ্চনাদি) পরিত্যাগ ক'রে সার বস্তু ভগবানকে গ্রহণ করে। চালুনি যেমন তার বস্তুসকল পরিত্যাগ ক'রে অসার বস্তুগুলি নিজের ভেতর রাখে, সেইরূপ সংসারে কতকগুলি লোক সার বস্তু ঈশ্বরকে পরিত্যাগ ক'রে অসার বস্তু কামকাঞ্চনাদি গ্রহণ করে।

৩। বিষয়ী লোকদের মন গুবরে পোকার মতো। গোবরের পোকা গোবরের ভেতর থাকতে ভালবাসে। যদি গোবর ছাড়া তাদের কিছু দাও, তাহলে ভাল লাগে না। জোর ক'রে যদি পদ্মের ভেতর বসিয়ে দাও তা হলে তারা ছটফট ক'রে মরে। বিষয়ী লোকেদের মনে সেইরকম বিষয়কথা ছাড়া অন্য কিছু ভাল লাগে না। যদি ঈশ্বরীয় কথা-প্রসঙ্গ হয় তারা সে স্থান ত্যাগ ক'রে যেখানে বাজে কথা হয় সেখানে গিয়ে বসে।

৪। যেমন কতকগুলো মাছ জলে আটকালে আদপে পালাতে চেষ্টা করে না, অমনি পড়ে থাকে; আবার কতকগুলি মাছ পালাবার জন্য লম্ফঝম্ফ করে, কিন্তু পালাতে পারে না; আবার একজাতীয় মাছ আছে, যারা জাল ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। এ সংসারে জীবও সেইরূপ তিন রকমের আছে; যথা - বদ্ধ, মুমুক্ষু ও মুক্ত।

৫। পথে যেতে যেতে রাত হয়ে পড়ায় ও আকাশে মেঘঝড়ের মতো হওয়ায় এক মেছুনী এক মালীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। মালী ফুলের ঘরের দাওয়ায় তাকে আশ্রয় দিয়ে যথাসাধ্য তার সেবা করলে, কিন্তু কিছুতেই তার ঘুম হল না। শেষে সে বুঝতে পারলে বাগানে নানা ফুল ফুটেছে ও সেই ফুলের গন্ধে তার ঘুম হচ্ছে না। সে তখনি আঁশচুপড়িতে জল ছিটিয়ে মাথার কাছে রেখে ঘুমুল। বিষয়বদ্ধ জীবেরও মেছুনীর মতো সংসারে পচা গন্ধ ছাড়া আর কিছুই ভাল লাগে না।

৬। পায়রার ছানার গলায় হাত দিলে যেমন মটর গজ গজ করে, সেইরকম বদ্ধ জীবের সঙ্গে কথা কইলে টের পাওয়া যায়, বিষয়বাসনা তাদের ভেতর গজ গজ করছে। বিষয়ই তাদের ভাল লাগে, ধর্মকথা ভাল লাগে না।

৭। যে মূলো খেয়েছে, তার ঢেঁকুরেতেই টের পাওয়া যায়, তেমনি যে ধার্মিক তার সঙ্গে আলাপ কল্লে সে কেবল ধর্মপ্রসঙ্গই ক'রে থাকে; আর যে বিষয়ী, সে বিষয়ের কথাই বলে থাকে।

৮। দুরকম মাছি আছে - একরকম মধুমাছি, তারা মধু ভিন্ন আর কিছুই খায় না। আর একরকম মাছি মধুতেও বসে, আর যদি পচা ঘা পায় তখনি মধু ফেলে পচা ঘায়ে গিয়ে বসে। সেই রকম দুই প্রকৃতির লোক আছে - যারা ঈশ্বরানুরাগী, তারা ভগবানের কথা ছাড়া অন্য প্রসঙ্গ করতেই পারে না; আর যারা সংসারাসক্ত জীব, তারা ঈশ্বরীয় কথা শুনতে শুনতে যদি কেহ কাম-কাঞ্চনের কথা কয়, তা হলে ঈশ্বরীয় কথা ফেলে তখনই তাতে মত্ত হয়।

৯। বদ্ধ জীব হরিনাম আপনিও শোনে না, পরকেও শুনতে দেয় না, ধর্ম ও ধার্মিকদের নিন্দা করতে থাকে, কেহ ধ্যান-ধারণা করলে তাকে নানা প্রকার ঠাট্টা করে।

১০। যেমন কুমীরের গায়ে অস্ত্র মারলে অস্ত্র ঠিকরে পড়ে যায় - তার গায়ে কিছুতেই লাগে না, তেমনি বদ্ধ জীবের কাছে ধর্মকথা যতই বল না কেন, কিছুতেই তাদের প্রাণে লাগাতে পারবে না।

১১। সূর্যের কিরণ সব জায়গায় সমান পড়লেও জলের ভেতর, আরশিতে ও সকল স্বচ্ছ জিনিসের ভেতর বেশী প্রকাশ দেখায়। ভগবানের বিকাশ সকল হৃদয়ে সমান হলেও সাধুদের হৃদয়ে বেশী প্রকাশ পাওয়া যায়।

১২। সকল পিঠের এঁটেল একপ্রকার হলেও পুরের যেমন প্রভেদ থাকে - কারও ভেতর নারকেলের পুর, কারও ভেতর ক্ষীরের পুর ইত্যাদি, সেইরূপ মানুষ সব একজাতীয় হলেও গুণে স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে।

১৩। জল সব নারায়ণ বটে, কিন্তু সকল জল পান করা যায় না। সকল স্থানে ঈশ্বর আছেন বটে, কিন্তু সকল জায়গায় যাওয়া যায় না। যেমন কোন জলে পা ধোয়া যায়, কোন জলে মুখ ধোয়া যায়, কোন জল বা খাওয়া যায়, আবার কোন কোন জল ছোঁওয়া পর্যন্ত যায় না, তেমনি কোন কোন জায়গায় যাওয়া যায় ও কোন জায়গায় দূরে থেকে গড় ক'রে পালাতে হয়।

১৪। বাঘের ভেতরেও ঈশ্বর আছেন সত্য বটে, কিন্তু বাঘের সুমুখে যাওয়া উচিত নয়। কুলোকের মধ্যেও ঈশ্বর আছেন সত্য, কিন্তু কুলোকের সঙ্গ করা উচিত নয়।

১৫। গুরু এক শিষ্যকে উপদেশ দিয়ে বল্লেন, "সকল পদার্থই নারায়ণ।" শিষ্যও তাই বুঝলেন। একদিন পথের মধ্যে একটি হাতী আসছিল, ওপর হতে মাহুত বললে "সরে যাও।" শিষ্য ভাবলে, "আমি সরে যাব কেন? আমিও নারায়ণ, হাতীও নারায়ণ, নারায়ণের কাছে নারায়ণের ভয় কি?" সে সরল না। শেষে হাতী শুঁড়ে করে তাকে দূরে ফেলে দিলে, তাতে তার বড় ব্যথা লাগল। পরে সে গুরুর কাছে এসে সমস্ত ঘটনা জানালে গুরু বললেন, "ভাল বলেছ - তুমি নারায়ণ, হাতীও নারায়ণ, কিন্তু ওপর থেকে মাহুতরূপী নারায়ণ তোমাকে সাবধান হতে বলেছিলেন, তুমি মাহুত নারায়ণের কথা শুনলে না কেন?"

১৬। সতের রাগ কি রকম জান? যেমন জলের দাগ। জলে একটা দাগ দিলে তখনই যেমন আবার মিলিয়ে যায়, তেমনি সতের রাগ হয় আর তখনি থেমে যায়।

১৭। ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মালে সব ব্রাহ্মণ হয় বটে, কিন্তু কেউ খুব পণ্ডিত হয়, কেউ ঠাকুরপুজো করে, কেউ বা ভাত রাঁধে এবং কেউ বা বেশ্যার দ্বারে গড়াগড়ি যায়।

১৮। যেমন কষ্টিপাথরে সোনা কি পিতল দাগ দেওয়া মাত্র ধরা যায়, তেমনি ভগবানের নিকট সরল কিংবা কপট পরীক্ষা হয়ে থাকে।

১৯। মানুষ দুরকম - মানুষ ও মানহুঁশ। যাঁরা ভগবানের জন্য ব্যাকুল তাঁদের মানহুঁশ বলে; আর যারা কামিনী-কাঞ্চনরূপ বিষয় নিয়ে মত্ত, তারা সব সাধারণ মানুষ।

২০। বদ্ধ সংসারী লোকের কিছুতেই আর হুঁশ হয় না। সংসারে নানা দুঃখকষ্ট ও বিপদে পড়েও তবু তাদের চৈতন্য হয় না। যেমন উট কাঁটা ঘাস খেতে ভালবাসে, খেতে খেতে মুখ দিয়ে রক্ত দর দর ক'রে পড়ে, তবুও সে কাঁটা ঘাস খেতে ছাড়বে না; তেমনি সংসারী লোকেরা কত যে শোক-তাপ পায়, কিছু দিনের পরই আবার যেমন তেমনি।

২১। মুখহলসা, ভেতরবুঁদে, কানতুলসে, দীঘল-ঘোমটা নারী।
আর পানাপুকুরের শীতল জল বড় মন্দকারী॥
- এইরকম লক্ষণ যাদের আছে, সেই সব লোকের কাছ থেকে সাবধান থাকবে।

No comments:

Post a Comment